বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এলো দুর্ঘটনার মূল কারণ


প্রকাশ : (৪ ঘন্টা আগে)
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এলো দুর্ঘটনার মূল কারণ

রাজধানীর দিয়াবাড়ীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় গঠিত সরকারি তদন্ত কমিশন উড়োজাহাজটির কোনো কারিগরি ত্রুটি খুঁজে পায়নি। বরং তদন্তে উঠে এসেছে, পাইলটের প্রশিক্ষণে ধারাবাহিকতার অভাব, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পর্যাপ্ত তদারকির ঘাটতি এবং কিছু পরিবেশগত প্রভাব মিলেই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামগ্রিক মূল্যায়নে দুর্ঘটনার মূল কারণ ছিল ‘মানবিক ত্রুটি (হিউম্যান এরর), যা পরিবেশগত প্রভাবকের কারণে আরও ত্বরান্বিত হয়েছে।’

২০২৫ সালের ২১ জুলাই বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি এফ-৭বিজিআই প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী ভবনে বিধ্বস্ত হয়। এ দুর্ঘটনায় পাইলটসহ মোট ৩৬ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিনজন শিক্ষক, তিনজন অভিভাবক এবং একজন স্কুলকর্মী ছিলেন। আহত হন আরও অনেকে।

তদন্তে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার দিন আবহাওয়া স্বাভাবিক ছিল এবং উড্ডয়নের আগে বিমানটির সব ধরনের কারিগরি পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ সম্পন্ন করা হয়েছিল। উড্ডয়নের সময় ইঞ্জিন, হাইড্রোলিক সিস্টেম কিংবা ফ্লাইট কন্ট্রোল সিস্টেমে কোনো ধরনের ত্রুটির সংকেতও পাওয়া যায়নি।

দুর্ঘটনার পর বিমানের ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার (এফডিআর) বিশ্লেষণের জন্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠানো হয়। সেই তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, একটি পর্যায়ে বিমানটির কাত হওয়ার মাত্রা (ব্যাংক অ্যাঙ্গেল) দ্রুত বেড়ে যায়। একই সময়ে পাইলট কন্ট্রোল স্টিক জোরে টেনে ধরায় বিমানের ‘অ্যাঙ্গেল অব অ্যাটাক’ নিরাপদ সীমা অতিক্রম করে। ফলে বিমানটি ‘স্টল’ অবস্থায় চলে যায় এবং দ্রুত উচ্চতা হারিয়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে পড়ে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সংকটময় মুহূর্তে পাইলট বিমানটিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলেও সফল হননি। তদন্তকারীদের মতে, পর্যাপ্ত বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণের অভাব এবং চাপের মধ্যে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতার ঘাটতি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এছাড়া দায়িত্বপ্রাপ্ত কমান্ডিং অফিসারের তদারকিতেও দুর্বলতা ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তে বলা হয়, এটি ছিল পাইলটের প্রথম একক (সলো) প্রশিক্ষণ ফ্লাইট। কিন্তু ফ্লাইট চলাকালে তাকে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, তা নির্ধারিত প্রশিক্ষণ পদ্ধতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। সংকটের সময় পাইলটকে একাধিকবার সতর্ক করা হলেও শেষ পর্যন্ত দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়নি।

তদন্ত কমিশন আরও জানিয়েছে, স্কুল ভবনের সিসিটিভি ফুটেজে বিমানের উইন্ডশিল্ডে একটি কালো দাগ দেখা যায়। এটি পাখি বা অন্য কোনো উড়ন্ত বস্তুর আঘাতের কারণে হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পাইলট হঠাৎ গতিপথ পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই এটিকে সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাবক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে ভবনটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়েও গুরুতর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। তদন্তে দেখা যায়, ১৯টি শ্রেণিকক্ষবিশিষ্ট ভবনটিতে শত শত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের জন্য মাত্র একটি সিঁড়ি ছিল। ফলে দুর্ঘটনার পর আগুন ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই দ্রুত বের হতে পারেননি। এছাড়া ভবন নির্মাণের অনুমোদনসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও স্কুল কর্তৃপক্ষ দেখাতে পারেনি।

ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে তদন্ত কমিশন ৩০ দফা সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন, পাইলটদের ধারাবাহিক দক্ষতা উন্নয়ন, তদারকি জোরদার, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বাইরে প্রশিক্ষণ ফ্লাইট পরিচালনা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণে নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করার বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তদন্ত কমিশনের সদস্যদের মতে, এই প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে শুধু দুর্ঘটনার কারণই নয়, ভবিষ্যতে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা হওয়াও জরুরি।

বিজ্ঞাপন